পাঠাগার বার্তা ডেস্ক : জ্যোতির্বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার ১২৯তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর গরিব একটি পরিবারে তিনি ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা জগন্নাথ সাহা ও মা ভুবনেশ্বরী দেবী।
বাবার ছোট দোকান থেকে যা আয়ে হতো, তা দিয়ে কোনোমতে টেনেটুনে চলতো সংসার। ছোটবেলা থেকেই মেঘনাদ ছিলেন খুব মেধাবী। কিন্তু বাবা-মা তাদের আর্থিক অবস্থার কারণে তাকে পড়াশোনা শেখাতে আগ্রহী ছিলেন না।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হওয়ার পর তারা চাইলেন, মেঘনাদ পড়াশোনা ছেড়ে দোকানের কাজে সাহায্য করুক। কিন্তু তার ইচ্ছা ছিল, আরও পড়াশোনা করার। শেষ পর্যন্ত তার মেধা ও আগ্রহ দেখে এগিয়ে এলেন স্থানীয় এক ডাক্তার, অনন্ত কুমার। সামান্য কিছু কাজের বিনিময়ে তিনি রাজি হলেন মেঘনাদের পড়াশোনার খরচ যোগাতে।
স্থানীয় স্কুল থেকে পাশ করার পর ১৯০৫ সালে মেঘনাদ ভর্তি হলেন ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে। কিন্তু স্বদেশি আন্দোলনের সাথে যুক্ত হওয়ার কারণে তাকে সেখান থেকে বহিষ্কার করা হয়। তারপর তিনি ভর্তি হন ঢাকা কলেজে এবং সেখান থেকে পাশ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য ১৯১১ সালে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে। প্রেসিডেন্সিতে সাহা পেলেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, সারদা প্রসন্ন দাস ও প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো বিশিষ্ট শিক্ষকদের। সহপাঠী হিসেবে পাশে পেলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জ্ঞ্যান ঘোষ ও জেএন মুখার্জির মতো মানুষদের।
১৯১৩ সালে তিনি ‘গণিত’ (ম্যাথামেটিক্স) বিষয় নিয়ে বিএসসি ও ১৯১৫ সালে ‘ফলিত গণিত’ (অ্যাপলায়েড ম্যাথামেটিক্স) নিয়ে এমএসসি পাশ করেন। ১৯১৬ সালে মেঘনাদ সাহা অ্যাপলায়েড ম্যাথামেটিক্সের অধ্যাপক হিসেবে কলকাতার সায়েন্স কলেজে (ইউনিভার্সিটি কলেজ অফ সায়েন্স, কলকাতা) যোগ দেন এবং কিছুদিন পরে তাকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়।
সেখানে তিনি হাইড্রোস্ট্যাটিক্স, স্পেকট্রোস্কপি ও থারমোডাইনামিক্সের মতন বিষয় পড়ানোর পাশাপাশি গবেষণার কাজ করতে শুরু করেন। ১৯১৭ সালে তিনি ‘অ্যাস্ট্রোফিজিকাল জার্নাল’-এ ‘সিলেক্টিভ রেডিয়েশন প্রেশার’ নিয়ে একটা দীর্ঘ লেখা লিখে পাঠান যা টাকার অভাবে পুরোটা ছাপা হয়নি, শুধুমাত্র একটা সংক্ষিপ্ত লেখাই ছাপানো হয়। ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে ‘ডক্টর অফ সায়েন্স’ উপাধি দেয়া হয়। এ বছরই ‘হার্ভার্ড ক্লাসিফিকেশন অফ স্টেলার স্পেক্ট্রা’ বিষয়ে গবেষণার জন্য তিনি প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন।
১৯২০ সালে সাহা তার জ্যোতির্বিজ্ঞান সংক্রান্ত চারটি গবেষণামূলক রচনা ‘দ্য ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিন’-এ প্রকাশ করেন এবং তার থিসিসের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ‘গ্রিফিথ পুরস্কার’ প্রদান করে। মেঘনাদ সাহা হলেন প্রথম বৈজ্ঞানিক যিনি বিভিন্ন তারার রঙের বর্ণালির (স্পেক্ট্রাম) মাধ্যমে তাদের তাপমাত্রা নির্ধারণ করার উপায় আবিষ্কার করেছিলেন, যা আজও অ্যাস্ট্রোফিজিক্স এবং অ্যাস্ট্রোকেমিস্ট্রির মূলভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি তার ‘থিওরী অফ আওনাইজেসন’ এর মাধ্যমে তারার রঙের উৎপত্তির ব্যাখ্যা করেছিলেন এবং নিজেরই আবিষ্কার করা ইকুয়েশন, যা ‘সাহা আওনাইজেসন ইকুয়েশন’ নামে বিখ্যাত, ব্যবহার করে তারাদের রাসায়নিক ও শারীরিক অবস্থা ঠিক ভাবে নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তার এই গবেষণার জন্য তিনি বহুবার পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন, কিন্তু প্রত্যেকবারই তাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। পরবর্তীকালে মেঘনাদ সাহা রাজনীতির সাথে যুক্ত হন এবং ১৯৫২ সালে লোকসভার সাংসদ হিসাবেও নির্বাচিত হন।
১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মেঘনাদ সাহার মৃত্যু হয়। দিল্লীতে রাষ্ট্রপতি ভবনে ‘প্ল্যানিং কমিশন’-এর অফিসে যাওয়ার রাস্তায় তার হার্ট অ্যাটাক হয় এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়ই তার মৃত্যু হয়। পরদিন কলকাতার কেওরাতলা মহাশ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : রত্নদীপ দাস (রাজু)
মোবাইল : +৮৮০১৭৩৭-৯১২৪৯৬
ইমেইল : pathagarbarta@gmail.com
info@pathagarbarta.com
Copyright © 2026 পাঠাগার বার্তা. All rights reserved.