প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২২, ২০২৬, ৮:২৫ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৫, ১১:১৭ অপরাহ্ণ
পাইলগাঁওয়ের শেষ জমিদার এডভোকেট ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী

পাইলগাঁওয়ের শেষ জমিদার এডভোকেট ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী
এডভোকেট ভিডি নিউটন
জমিদার ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী। সিলেট জজ কোর্টের আইনজীবী, একজন অনারারী ম্যাজিষ্ট্রেট, সিলেট রসময় মেমোরিয়াল হাইস্কুলের প্রতিষ্টাতা, সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের প্রতিষ্টাতা, সিলেট সরকারী মহিলা কলেজের প্রতিষ্টাতা অধ্যক্ষ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেতা, একজন বিপ্লবী, সিলেট বিভাগের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সভাপতি, আসাম আইন পরিষদের সদস্য এবং পাইলগাঁও জমিদার পরিবারের শেষ জমিদার।
১৮৮২ সালে সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও গ্রামের বিখ্যাত জমিদার বংশে ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী জন্ম গ্রহন করেন। পাইলগাঁওয়ের জমিদার ব্রজনাথ চৌধুরীর দুই ছেলে রসময় চৌধুরী ও সুখময় চৌধুরী। প্রজাহিতৈষী জমিদার রসময় চৌধুরীর ছেলে হলেন ব্রজেন্দ্র নারায়ন চৌধুরী।
১৮৯৮ সালে ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী সিলেট সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এন্ট্রাস পাশ করেন। ১৯০০ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯০২ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। ১৯০৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস ও অর্থনীতিতে কৃতিত্বের সাথে এম এ পাস করেন এবং স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯০৬ সালে আইনে ডিগ্রী অর্জন করেন।
১৯০৬ সালে ব্রজেন্দ্র নারায়ন চৌধুরী তাঁর কাকাতো বোন অর্থাৎ সুখময় চৌধুরীর একমাত্র কন্যা সুপ্রভা চৌধুরীকে লাখাই দত্ত বংশের সন্তান এডভোকেট ধর্মদাস দত্তের কাছে বিয়ে দেন। ১৯০৭ সালে সিলেট বারে আইন পেশায় যোগদান করেন। ১৯০৮ সালে তাঁর পিতার মৃত্যু হলে আইন পেশা ছেড়ে দিয়ে পাইল গাঁওয়ের জমিদারীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাজনীতি ও সমাজসেবার কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে বৃহত্তর সিলেট জেলা যখন পুনরায় আসাম প্রদেশে যুক্ত হয়, সেই থেকে তিনি সিলেটকে বঙ্গ প্রদেশের সঙ্গে সংযুক্ত রাখতে আন্দোলন করেন।
১৯২০ সালে গঠন করেন Sylhet Re Union League। এ সময় রায় বাহাদুর গিরিশ চন্দ্র নাগ ও রায় বাহাদুর রমণী মোহন দাস তাঁর সহকর্মী হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯২৩ সালে ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী স্বরাজ পার্টির সিলেট জেলার নেতা হিসেবে কাজ করেন। ১৯২৪ সালে সুরমা উপত্যকা রাষ্ট্রীয় সম্মিলনের ষষ্ঠ অধিবেশনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি মনোনিত হন। সুনামগঞ্জ জেলায় অনুষ্ঠিত এ সম্মিলনের সভানেত্রীত্ব করেন শ্রীমতি সরোজিনী নাইডু। ১৯২৬ সালে ব্রজেন্দ্র নারায়ন চৌধুরী তাঁর ঠাকুর দাদার নামে পাইল গাও ব্রজনাথ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্টা করেন। ১৯২৬ সালে ব্রজেন্দ্র নারায়ন চৌধুরী তাঁর পিতা রসময় চৌধুরীর নামে সিলেট শহরে রসময় মেমোরিয়াল হাইস্কুল প্রতিষ্টা করেন। ১৯২৯ সালে সিলেট কাছাড় বন্যা সাহায্য কমিটির অর্গেনাইজার ও সেক্রেটারী নিযুক্ত হন। ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনের সময় সিলেট জেলা কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৩০ সালে ৩ মে ব্রজেন্দ্র নারায়ন চৌধুরীকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। তিনমাস পর মুক্তি পান। ১৯৩২ সালে গ্রেফতার হয়ে দুই বৎসরের জন্য আবার কারারুদ্ধ হন। ১৯৩৫ সালে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় আসাম প্রাদেশিক পরিষদের মেম্বার নির্বাচিত হন। ১৯৩৯ সালে সিলেট শহরের চৌহাট্টায় নিজ বাড়িতে সিলেট মহিলা কলেজ প্রতিষ্টা করেন এবং দুই বৎসর অবৈতনিক অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ নামকরন হয়েছে।
১৯৩৯ সালে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু সিলেট শহরে আগমন ঘটলে ব্রজেন্দ্র নারায়ন চৌধুরীর চৌহাট্রায় বাসায় নেতাজীকে আপ্যায়ন করা হয়। ১৯৪০ সালে আসাম পার্লামেন্টের মেম্বার নির্বাচিত হন। ১৯৪১ সালে কংগ্রেস হাই কমান্ডের সাথে মতবিরোধ হওয়ায় আসাম পার্লামেন্টের মেম্বার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৪১ সালে রাজনীতি থেকে অবসরগ্রহণ করে সিলেট শহরে জনশক্তি প্রেস নামে প্রতিষ্ঠান করে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। বহু দিন এই প্রেসের মাধ্যমে স্বদেশী আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন। এখান থেকে পাইলগাঁও ধর বংশ এবং স্মৃতি ও প্রীতি দুটি গ্রন্থ রচনা করে প্রকাশ করেন।
১৯৪৭ সালে সিলেট গণভোটের সময় কংগ্রেসের পক্ষে কাজ করেন। ১৯৪৭ সালে লাখাই থানার নোয়াগাও রায়টের সময় বামৈ গ্রামে গিয়ে হিন্দু মুসলমানদের নিয়ে শান্তি মিশন প্রতিষ্টা করেন। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগের পর বিভিন্ন হিন্দু পরিবারের লোকজনসহ হিন্দু নেতারাও যখন ভারতে চলে যান, সে সময় তার বংশীয় অনেক লোক ভারতে পাড়ি জমালেও ব্রজেন্দ্র নারায়ন চৌধুরী স্বদেশের মায়া ত্যাগ করতে পারেননি। তখন নিজ বাড়িতে পাইলগাঁও ও সিলেট শহরের বাসায় থেকে নিজের স্থাপিত স্কুলসমূহের পরিচালনাসহ বিভিন্ন জনসেবার কাজে অবসর সময় ব্যয় করেন ।
১৯৭২ সালে ব্রজেন্দ্র নারায়ন চৌধুরী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় নেয়া হয়। ১৯৭২ সালের ১ সেপ্টেম্বর পাইলগাঁওয়ের শেষ জমিদার ব্রজেন্দ্র নারায়ন চৌধুরী কলকাতায় মৃত্যুবরন করেন।
লেখক: প্রাবন্ধিক।
সম্পাদক ও প্রকাশক : রত্নদীপ দাস (রাজু)
মোবাইল : +৮৮০১৭৩৭-৯১২৪৯৬
ইমেইল : pathagarbarta@gmail.com
info@pathagarbarta.com
Copyright © 2026 পাঠাগার বার্তা. All rights reserved.