প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২২, ২০২৬, ৮:২৪ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ আগস্ট ৭, ২০২৫, ৪:৫৫ অপরাহ্ণ
স্মারকগ্রন্থ ‘কালের অভিজ্ঞান’ : একটি ঐতিহাসিক দলিল

স্মারকগ্রন্থ ‘কালের অভিজ্ঞান’ : একটি ঐতিহাসিক দলিল
রূপক রাজ বৈদ্য
বই মানুষের পরম বন্ধু, যা আমাদের নিঃস্বার্থভাবে দান করে জ্ঞান, করে তুলে প্রজ্ঞাবান। কিছু বই আছে লেখক চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা থেকে লিখে আমাদের জ্ঞানের ভান্ডার সমৃদ্ধ করেন। আবার কিছু বই থাকে যেখানে গবেষক তাঁর গবেষণালব্ধ ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্য উপাত্তের সমাহার করে থাকেন। যা আমাদের অতীত সম্পর্কে জ্ঞান দান করে। ‘কালের অভিজ্ঞান’ এমনই এক গ্রন্থ। কালের সাক্ষী হয়েই থাকবে আমাদের মনে। এই গ্রন্থে ব্রিটিশ শাসনামলের বৃহত্তর শ্রীহট্ট অধুনা সিলেট বিভাগের তৎকালীন স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার এক সমৃদ্ধ ধারা পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থার প্রশাসনিক প্রধান সরপঞ্চদের তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে। গ্রন্থটি নবীগঞ্জ থানার ৩৯ নং সার্কেল পঞ্চায়েতের দুই সহোদর সরপঞ্চ, স্বদেশী আন্দোলনের কর্মি-সমর্থক এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শ্রীমান সনাতন দাস ও শ্রীমান দীননাথ দাস এঁর জীবনী ও সেই সাথে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন প্রান্তে সরপঞ্চের দায়িত্ব পালনকারী আরো ১২০ জনের তথ্য সংবলিত। ইতিহাসের পাঠ থেকে বিলুপ্তপ্রায় এমন তথ্য সংগ্রহ কতটুকু কষ্টসাধ্য তা কেবল একজন গবেষক জানেন ও তাঁর সাহিত্যের প্রতি একনিষ্টতার দরুন সেই কষ্টকে সাদরে বরণ করে এমন দুর্মূল্য উপহার আমাদের বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে পারেন।
‘কালের অভিজ্ঞান’ স্মারকগ্রন্থটি এমন একজন লেখক সম্পাদনা করেছেন, যিনি দীর্ঘকাল ইংল্যান্ড প্রবাসী হলেও স্বদেশের প্রতি ভালোবাসায় উনার বিন্দুমাত্র কমতি নেই। যে সময়ে মানুষ খুঁজে একটু বিশ্রাম, একটু অবসর, সেই সময়ে এসে বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক জনাব মতিয়ার চৌধুরী এমন একটি গ্রন্থ আমাদের উপহার দিলেন, যার জন্য আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম উনার ও উনার সম্পাদনা পর্ষদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব। কারণ, এই বই আমাদের বঙ্গভূমির স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার ঐতিহাসিক ধারার সাথে পরিচিত করেছে। অনেকে সরপঞ্চ শব্দের সাথে পরিচিত নয়, তথাপি এই গ্রন্থ আমাদের সরপঞ্চ সম্পর্কে যেমন জ্ঞান দান করবে, তেমনি ১২০ জন সরপঞ্চের সাথেও পরিচিত করবে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এর বাংলা বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. শরদিন্দু ভট্টাচার্য এর মতে - ‘এই গ্রন্থ হলো আমাদের প্রাচীন তথ্য পুনরুদ্ধার এর এক অমূল্য সন্নিবেশ।’ সম্পাদকীয় পাতায় সাংবাদিক মতিয়ার চৌধুরী অত্যন্ত আক্ষেপ নিয়েই লিখেছেন- ‘আমাদের দেশে পারিবারিক ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না অথচ ইংল্যান্ডে একটা কুকুর বা ঘোড়ারও ৫/৬ পুরুষের ইতিহাস সংরক্ষিত থাকে।’ আমরা তো মানুষ। স্রষ্টার অন্যতম সৃষ্টি, যারা স্বীয় জ্ঞান ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের উন্নতি করছি ঠিকই কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষদের গৌরবময় ইতিহাস রক্ষা বা সংরক্ষণে উদাসীন। সেই জায়গায় ব্যাতিক্রমী একটি সংঘটন হলো - ‘সনাতন-দীননাথ কল্যাণ ট্রাস্ট’। এই ট্রাস্ট যেমন অতীত নিয়ে গবেষণা করছে ঠিক তেমনি সামাজিক ভাবধারার উন্নতি ঘটাতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যে ট্রাস্ট এর সম্পাদক হিসাবে কাজ করছেন ‘কালের অভিজ্ঞান’ এর আরেক সহযোগী সম্পাদক বাবু রত্নদীপ দাস (রাজু)।
সনাতন-দীননাথ ভ্রাতৃদ্বয় যে গ্রামে জন্মেছিলেন উনাদের ধারণ করে সেই গ্রাম সত্যি যেন মুক্তাহার হলো। কারণ এমন ক্ষণজন্মা, সমাজ সচেতন মানুষদের সব কাল, সব স্থান যেমন চিনতে পারে না, ঠিক তেমনি অনেকে প্রদীপের নিচে পড়ে বিলীন হয়ে যান। কিন্তু এই দুই সহোদর যেমন নিজেদের প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি আলোকিত করেছেন এই সমাজকে। ন্যায় বিচারক হিসাবে ছিলো সুনাম। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার আদায়ে যেমন ছিলেন আপোষহীন তেমনি ছিলেন অন্যায়ের প্রতিবাদী। তৎকালীন সময়ে সমবায় সমিতি গঠন, কৃষকের উন্নয়নে ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। দুই ভাই-ই ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। শ্রীমান সনাতন দাস ও শ্রীমান দীননাথ দাসের পিতা শ্রীমান গঙ্গারাম দাস ছিলেন ওই সময়ের নবীগঞ্জ মুন্সেফী কোর্টের একজন কর্মচারী। যোগ্য উত্তরসূরি শ্রীমান দীননাথ দাস এর বংশলতিকায় উনারই নাতি বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বর্গীয় রবীন্দ্র চন্দ্র দাস এর সুযোগ্য পুত্র শ্রী রত্নদীপ দাস (রাজু) এঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় নিজ গ্রাম মুক্তাহারে গড়ে উঠা সাহিত্য-পাঠাগার ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা শ্রী রবীন্দ্র চন্দ্র দাস গ্রন্থাগার’। এই গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষের নামকরণ করেছেন ‘সনাতন-দীননাথ পাঠকক্ষ’। এতেই সাক্ষ্য দেয় রত্নদীপ দাস (রাজু) একজন ইতিহাস সচেতন ব্যক্তি।
স্মারকগ্রন্থ ‘কালের অভিজ্ঞান’ আগমী প্রজন্মের জন্য ইতিহাসের এক সাক্ষী হয়ে থাকবে। উক্ত গ্রন্থে সরপঞ্চদের জীবনী তুলে ধরার পাশাপাশি সরপঞ্চ ও সরপঞ্চের মেম্বারদের দায়িত্ব অর্পন সম্পর্কিত ব্রিটিশ সরকারের সিলেট ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক প্রদত্ত সীল ও স্বাক্ষর সন্নিবেশিত দলিলপত্র ও সনদ গ্রন্থের মর্যাদাকে বৃদ্ধি করেছে অনেকাংশে। আমি স্মারকগ্রন্থ ‘কালের অভিজ্ঞান’ এর বহুল প্রচার ও পাঠকপ্রিয়তা কামনা করছি।
লেখক: কবি ও পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।
সম্পাদক ও প্রকাশক : রত্নদীপ দাস (রাজু)
মোবাইল : +৮৮০১৭৩৭-৯১২৪৯৬
ইমেইল : pathagarbarta@gmail.com
info@pathagarbarta.com
Copyright © 2026 পাঠাগার বার্তা. All rights reserved.