
লিয়াকত হোসেন খোকন
নগরীতে প্রায় প্রতি রাতের ঘটনা। প্রায় রাতের উৎপাত। সামাজিক দায় দায়িত্বহীন কুনাগরিকদের বিয়ে -সাদির নামে সারা রাতের মোচ্ছব কথা। বিকট শব্দে মাইক্রোফোন, মদের ফোয়ারা, উচ্ছৃঙ্খল ছেলেপুলেদের বিকট উল্লাসের ধারাবাহিকতা। এটাই এখন কালচার। এতে অবশ্যই আছে অভিভাবকদের প্রচ্ছন্ন মদত। সায় না দিলে বা না থাকলে কি কোনও বাড়ির সন্তান এমন অসামাজিক কাজ করতে পারে।
কিন্তু শহর -নগর একসময় এমন ছিল না। বিয়ের অনুষ্ঠানে রুচি ছিল। লোকাচার ছিল। সমাজ ভাবনা ছিল। কিন্তু দেখতে দেখতে শহর -নগরগুলো অধঃপতিত হয়ে গেল।
একশ্রেণির মানুষের ভাণ্ডার যতই কালো টাকার স্ফীত হতে শুরু করল, নিষিদ্ধ পথে অর্থাগম শুরু হল তখনই মানুষ আস্তে আস্তে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এল তার আদি রূপে। সমাজে সংকট ডেকে আনল। মেধাবী ছেলেমেয়েরা ক্যারিয়ারের সুযোগে এ ধরনের আনন্দ উল্লাসের শহর -নগর ছেড়েছে অনেক আগেই। এদিকে স্বপ্নসন্ধানী পড়ুয়াদের এক বড় অংশ এক পা বাড়িয়ে রেখেছে নিজেদের ক্যারিয়ার গঠনের জন্য কোনো নির্ঝঞ্ঝাট শহরের পানে। বড়ো শহর -নগরের পুরনো বাড়িগুলো প্রায় বিক্রি হয়ে গেছে।
তারপর কারা এলো? স্বাভাবিকভাবেই এক নব্য ও লঘু সমাজ। বর্তমান কালে এদের আচার -ব্যবহার,
সমাজ ভাবনা দেখে আশংকা ক্রমেই দুশ্চিন্তায় রূপ নিচ্ছে। এই যে এরা, কারা এরা? রাস্তায় ময়লা আবর্জনার স্তূপ ফেলে রাখে রাস্তার মধ্যখানে । রাস্তা -ফুটপাত দখল রাখে, সুযোগ পেলেই খাল আর ড্রেনের ওপর বাড়ি নির্মাণ করে, করে অট্টালিকা নির্মাণ। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বাড়ায়, তেল লুকিয়ে রেখে করে তেলেসমাতি।
এদের নিয়ে শহর – মহানগরে জনগণের সেবা ও উন্নীত হবে কি ভাবে?
গাড়ির চালকের আসনে বসা ব্যক্তির উপর নির্ভর করে যাত্রী সুরক্ষা। সমাজের বা প্রশাসনের ড্রাইভিং সিটে বসা ব্যক্তিরা যদি ঠিক না থাকেন তাহলে সমাজের এমন অবস্থা হওয়াই স্বাভাবিক। যে সব মানুষ সমাজবিরোধী তাদের রেয়াত কিসের স্বার্থে?
দূষণ বলতে আমরা বুঝি গাড়ির ধোঁয়া, জমে থাকা নোংরা, ফেলে দেয়া আবর্জনা প্লাস্টিক আর জঞ্জালের স্তূপ। শব্দ দূষণ যে এক নীরব ঘাতক সেটা উপলব্ধি করতে গেলে যে বোধের জায়গায় সমাজকে পৌঁছতে হয় সেখানে যেতে আমাদের এখনও অনেক বাকি।
কল্যাণের জন্য আহুত ধর্মসভায় বিকট শব্দে বাজতে থাকা লাউডস্পিকার মানুষের জন্য যে কত অকাল্যাণকর সেটা আমাদের উপলব্ধিতে এখনও আসা বাকি। শব্দ দূষণের সামষ্টিক ক্ষতি সম্পর্কে মানুষ মোটেও ওয়াকিবহাল নয়। একের অনলে বহুর আহুতি দেওয়ার মধ্যে জনগণের কোনও পরিতাপ নেই, নেই কোনো অনুশোচনা।
কথায় কথায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।
গ্যাস চুরি করে, বিদ্যুৎ চুরি করে, প্রকল্পের টাকা চুরি করে, দুর্নীতি করে বিশাল বিশাল অট্টালিকা বানায়।
এসব ক্ষেত্রে আইনের হাত ধরেই ডান্ডা মেরে ঠান্ডা করা ছাড়া আর কী উপায় আছে?
দেশে দেশে দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিধিমালা আছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য আলাদা টাস্কফোর্স আছে। যেহেতু শব্দের মাত্রার গ্রহণযোগ্যতা সবার জন্য সমান নয়, তাই সময়ের সাথে ডেসিবেলের হিসেবে বেঁধে দেয়া আছে। অমান্য করলে, জেল ও জরিমানা দুটোরই ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তার পালন কই?
মানুষ বা জনগণ এখনও বুঝতে পারছে না কী সাংঘাতিক ক্ষতির দিকে তারা এগিয়ে যাচ্ছে। লম্বা সময় ধরে শব্দ দূষণের মধ্যে বাস করলে হাইপার টেনশন, আলসার, হৃদরোগ, মাথাব্যথা, স্মরণশক্তি হ্রাস, নার্ভের সমস্যা ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি শুধু হয় এমন নয়, নার্ভের রিসেপ্টরগুলোও নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ধীরে ধীরে মানুষ স্মরণ শক্তি হারায়। শব্দ দূষণের ফলে মানুষ বধিরও হয়ে যায়। তাহলে এক শ্রেণির মানুষ শব্দ দূষণ করে নিরিহ মানুষকে কি খুন করছে না? এ খুনের বিচার কে করবে?
বিচার করার কেউ নেই বলেই কি চোখের জল মোছে গাইতে হবে – ‘ ও দয়াল বিচার করো….. দাও না তারে ফাঁসি ‘।
নোবেলজয়ী চিকিৎসক রবার্ট কোচ প্রায় একশ বছর আগে হুঁশিয়ার করেছিলেন, মানুষকে একদিন
শব্দ -দূষণের মোকাবিলা করতে হবে কলেরা এবং কীটপতঙ্গ ঠেকানোর মত সমান গুরুত্বের সঙ্গে।
কিন্তু কতিপয়ের নির্লিপ্ততা এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রশাসন এবং সমাজ দুয়ে মিলে যদি কাজ না হয় তবে উন্মত্ত বিকারগস্ত এসব মানুষের বুকের পাঠা চওড়া হবে। মেরুদণ্ডহীন তথাকথিত ভালো মানুষদের প্রতিবাদহীনতায় আর প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় দুস্কৃতীরা যেভাবে অকুতোভয় হচ্ছে, যেভাবে নাটকীয় পাপাচার করার প্রবল ইচ্ছা তাদের মনে চাঙ্গা দিয়ে উঠছে, এ অবস্থায় ধরে ধরে পুলিশি পিট্টি দেওয়া ছাড়া এসব কমানোর আর শর্টকাট কোনও রাস্তা আছে কি?
লেখক : প্রাবন্ধিক; রূপনগর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
Leave a Reply