1. admin@pathagarbarta.com : admin :
মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০২৪, ০২:৫৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
আন্দোলনের নামে মুক্তিযুদ্ধের অবমাননাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যার ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য বিশ্বের বিশিষ্টজনদের আহবান দুই বঙ্গকন্যা ব্রিটিশ মন্ত্রীসভায় স্থান পাওয়াতে বঙ্গবন্ধু লেখক সাংবাদিক ফোরামের আনন্দ সভা ও মিষ্টি বিতরন যৌন প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার নেটওয়ার্ক নিয়ারস্ নির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত অনুবাদক অধ্যক্ষ মোঃ কোরেশ খান এবং গবেষক ও ড.রণজিত সিংহের স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত সাংবাদিক শাহাব উদ্দিন বেলালকে স্মরণ ও স্মারক প্রকাশনা অনুষ্ঠিত সিলেটের মেয়রের কাছে আলতাব আলী ফাউন্ডেশনের স্মারকলিপি প্রদান মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার- দেবেশ চন্দ্র সান্যাল বৃটেনের কার্ডিফ বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের উদ্দ্যোগে ঈদ পূনর্মিলনী অনুষ্ঠিত অনলাইন সাহিত্য গ্রোপের ঈদ পুনর্মিলনী

আমার বাবা আমার আদর্শ

পাঠাগার বার্তা
  • আপডেট সময় : বৃহস্পতিবার, ২৫ আগস্ট, ২০২২
  • ১৯৩ বার পঠিত

আমার বাবা আমার আদর্শ

রত্না দাশ

মানব জীবনের অমোঘ পরিণতি মৃত্যু। কিন্তু মৃত্যু মানেই নিঃশেষ হওয়া বা হারিয়ে যাওয়া নয়। অনেকেই মৃত্যুর সাথে সাথে কালের অতল গহ্বরে বিলীন হয়ে যান। আবার কোন কোন ব্যক্তির প্রয়াণ সঙ্গত কারণেই হয়ে ওঠে মৃত্যুঞ্জয়ী মানুষের আলেখ্য। তেমনি একজন আমার বাবা প্রয়াত ডা. কুটিশ্বর দাশ (০১.০১.১৯২৪ – ০৪.০৪.১৯৯৫)। তাঁর জীবন ও কর্মের উপর বিশিষ্টজনদের লেখা প্রবন্ধ-নিবন্ধই তাঁকে আজও মানুষের অন্তরে জাগ্রত রেখেছে। মানুষের হৃদয়ে হয়তো তিনি জেগে থাকবেন অনন্তকাল।

বাবা তরুণ বয়সেই ব্যক্তিগত ও বৈষয়িক উন্নতি সাধনের পথকে পদদলিত করে শিক্ষা বিস্তার, অসহায় সুবিধা বঞ্চিত মানুষ ও এলাকার জন্য কাজ করার ব্রত গ্রহন করেন। গ্রাম্য কুটচাল, প্রতিহিংসা, মিথ্যাচার এসবের বিপরীতে সহজ জীবনাচরণ, পরোপকারীতা, সততা-আদর্শ; সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে সম্প্রীতির পরিবেশ অক্ষুন্ন রাখা ছিল তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি। একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নিয়েও রক্ষণশীলতা ও বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিলেন সর্বদা। সাধারণ মানুষ ও গ্রাম ছিল তাঁর আদর্শের জায়গা। একটি ইউনিয়নের প্রধান ব্যক্তি হিসেবে সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সাথে দায়িত্ব পালন করে তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যকে সমুন্নত রেখে ছিলেন।

পড়াশোনার প্রতি বাবার ছিল বেশি ঝোঁক। আমাদের সাথে পড়াশোনার কথা বলতেই তিনি বেশি আগ্রহী বোধ করতেন। পেশা ও সামাজিক বিভিন্ন কর্মকান্ডে ব্যস্ততম সময় পাড় করেও আমাদের পড়াশোনার অগ্রগতির খুঁজ নিতে ভুলতেন না। অধিকাংশ দিনই বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হতো, তারপরও আমরা কতটুকু পড়েছি ও শিখেছি তা যাচাই করে দেখতেন। শুধু নিজে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনাই নয়, আমাদের এলাকার বিভিন্ন গ্রামের দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের তিনি পড়াশোনা করতে আর্থিক সহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়াদিতে ব্যস্ত থাকার পরও বাবা একটি বৃহত্তর পরিবারের প্রধান চালক হিসেবে প্রত্যেকের ভালো মন্দের প্রতি খেয়াল রাখতেন সর্বদা। তাঁর স্নেহ দৃষ্টি থেকে বাদ পরতেন না বাড়ির কর্মচারীরাও।

১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের এক অনবদ্য অধ্যায়। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে দেশবাসী মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। এসময় পূর্ব বাংলার সকল ইউনিয়ন কাউন্সিলের (বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ) চেয়ারম্যানবৃন্দ দু’ভাগে বিভক্ত ছিলেন। অধিকাংশই ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষে কিছু সংখ্যক পাকিস্তানের পক্ষে। বাবা নবীগঞ্জ থানার অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, তৎকালীন জাতীয় সংসদের এমএনএ মেজর জেনারেল (অব:) এম এ রব, এমপিএ আব্দুল আজিজ চৌধুরী, নবীগঞ্জের সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেতা শ্যামাপ্রসন্ন দাশগুপ্ত (বিধুবাবু), চারু চন্দ্র দাস (স্বাধীনতা উত্তরকালে নবীগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি), আজিজুর রহমান চৌধুরী (ছুরুক মিয়া, চেয়ারম্যান), মহেন্দ্র কুমার দাশ রায় (সরপঞ্চ) প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে হানাদার বাহিনীর আক্রমণ তীব্র হতে থাকে। এসময় শ্রাবণ মাসের শেষ দিকে মনসা পূজার হাটে শান্তি কমিটির নেতাদের প্ররোচনায় পাকসেনারা নবীগঞ্জ এসে বর্বরোচিত গণহত্যা শুরু করে। এসময় বিশেষভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের প্রাণহানি ও বাড়ি-ঘর লুটপাট শুরু হলে, হিন্দুরা জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্নে পিতৃপুরুষের ভিটে মাটি ত্যাগ করে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিতে শুরু করে। ঐ সময় আমাদের গ্রামের প্রায় সবাই (কয়েকটি মুসলিম পরিবার ব্যতীত) ভারতের মৈলাম, বালাট সহ বিভিন্ন শরনার্থী শিবিরে চলে যান। কিন্তু আমরা তখনো বাড়িতেই। বাবা কিছুতেই এলাকা ছেড়ে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন না। কারণ বাবা তখন করগাঁও ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। তাঁর মতে, তিনি এমন ক্রান্তি কালে চলে গেলে সাধারণ মানুষ সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে সংকটে পরতে পারে। অবশেষে নবীগঞ্জের গণ্যমাণ্য ব্যক্তিবর্গের অনুরোধে পরিবারের সবাইকে নিয়ে আমাদের নিজস্ব গোস্তী নৌকায় করে সেপ্টেম্বর মাসের কোন একদিন ভারতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। এই স্মৃতি আজও মনে পড়ে। একসময় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ধর্মনগরের দেওয়ান পাশা গ্রামে৷ মায়ের মামার বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে আমরা দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত তিন মাস সেখানেই অবস্থান করি। সেই সময়ে আমার মায়ের মামা বাবু দীগেন্দ্র মাস্টার আমাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেন। আর বাবা তখন আমাদেরকে সেখানে রেখে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ শুরু করেন। বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সহ বিশিষ্টজনদের সাথে যোগাযোগ করেন। বিভিন্ন শরনার্থী শিবিরে দেশ ছেড়ে আসা লোকদের কল্যাণে কাজ করেন এবং যুবকদের উদ্ভুদ্ধ করতেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য। ঐ সময়টায় আমাদের জনশূন্য গ্রামে, হাজার বছর ধরে বংশ পরম্পরা যাদের সাথে আমরা একে অন্যের আত্মীয় হিসেবে বসবাস করে এসেছি, আমাদের পার্শ্ববর্তী গ্রামের তাদেরই কেউ কেউ ভিটে টুকু ছাড়া সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে যায়। আমার বাবা ছিলেন সহনশীল মানুষ। বাড়িতে ফেরার পর এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলার কথা বিবেচনা করে বাবা সহ তৎকালীন নেতৃবৃন্দ তা নিয়ে বাড়াবাড়িতে যাননি। অবশ্য লুটেরা ভয় পেয়ে সামান্য কিছু মালপত্র ফেরত দিয়েছিল। এহেন পরিস্থিতিতে আমাদের মতো বিত্তশালী পরিবারকেও তখন অর্থনৈতিকভাবে চরম সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। জীবনের এই চরম সংকটময় সময়েও বাবা আদর্শচ্যুত হননি। দেশে ফেরার পর যতটুকু না নিজের পরিবারের জন্য সময় দিয়েছেন, তারচেয়ে অনেক গুণ বেশি সময় দিয়েছেন সরকারি রিলিফ বন্টণ, গৃহহীনদের বাড়িঘর নির্মান এবং সরকারি ও সামাজিক কাজে।

বাবা প্রথম জীবনে ছিলেন হাইস্কুলের শিক্ষক, তারপর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা করতেন। চিকিৎসাকে পেশা হিসেবে নয়, সেবা হিসেবে নিয়েছিলেন। সমাজের বিত্তহীন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সেবা দিয়েগেছেন জীবনভর। বহুগুণে গুণান্বিত পিতাকে দেখেই আমার আদর্শ ও মানস গঠিত হয়েছে। বাবার দেখানো পথ ধরেই হাটছি সারাজীবন। আমার ছেলে-মেয়েদেরও সে পথে চালানোর চেষ্টা করছি। আমার মাও [প্রমিলা বালা দাশ (২৫.০২.১৯৩৬ – ১০.০৩.২০০৫)] ছিলেন একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারের মেয়ে এবং বাবার একজন প্রকৃত সহধর্মিণী। মা প্রথম জীবনে শিক্ষকতা করলেও পরে সাংসারিক ব্যস্ততার কারণে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত থাকা সম্ভব হয়নি। তিনি বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, সংস্কৃত, আরবি, ডস, উর্দু, তামিল এই ৮ টা ভাষা জানতেন। মা আজীবন একজন আদর্শ গৃহিণীর দায়িত্ব সামলেছেন। একান্নবর্তী পরিবারের বিশাল দায়িত্ব সামলেও ধর্মীয় অনুশাসন ও বিধিবিধান যথাযথভাবে পালন করছেন। আমার মা ও বাবা দুজনেই আজ ধরাধামে নেই। কোথায় আছেন তাও জানার সুযোগ নেই। মহান সৃষ্টিকর্তা যেন তাঁদের সর্বোৎকৃষ্ঠ স্থান প্রদান করুন এই প্রার্থনা সতত তাঁর চরণে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা, নবীগঞ্জ, হবিগঞ্জ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরও খবর

ফেসবুকে আমরা

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

error: Content is protected !!