
আহমেদ শাহাব
সুভাষচন্দ্র দাশ। নবীগঞ্জ গণপাঠাগারের প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই নামমাত্র সম্মানীতে গ্রন্থাগারিকের দায়িত্ব পালন করা সুভাষ আমার সহপাঠী বন্ধু। দীর্ঘ সাতাশ বছর ধরে একটি নিভু নিভু প্রতিষ্টানকে বাঁচিয়ে রাখা ধীমান, সংস্কৃতিকর্মী, সাহিত্য সমজদার, চিত্রশিল্পী প্রচার বিমুখ নিভৃতচারী সুভাষের বন্ধু আমি, এই অনুভূতিও আমাকে একবুক স্বস্তি এবং প্রশান্তি দেয়।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সুভাষ নবীগঞ্জ জে কে হাইস্কুলের তিয়াত্তর ব্যাচের মেধাবীদের অন্যতম একজন। স্কুলজীবন থেকেই তার আঁকাআঁকির হাতে খড়ি। আমরা যখন স্কুল থেকে দেয়াল পত্রিকা বের করতাম, তখন এর লেখা এবং ইলাস্ট্রেশনের দায়িত্ব পড়তো সুভাষের উপর। আর্থিক অনটনের কারণে লেখাপড়ায় খুব বেশিদূর যেতে পারেনি তাই আঁকাআঁকির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শুরু করে পেশাদার আর্টের কাজ। সুভাষের এই শিল্প পেশা আসলে হুট করে পেয়ে বসা নয় মুলত: তার পারিবারিক ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা। তার বাবা সুদর্শন দাশ সম্ভবত: নবীগঞ্জ জেকে হাইস্কুলের ১৯৪০ ব্যাচের ছাত্র এবং তৎকালের সাড়াজাগানো কবি রসময় দাশের সহপাঠী ছিলেন। রসময় দাশের কাব্যগ্রন্থ সোনার হরিণ অথবা অন্ত:শীলায় সুদর্শন দাশ সহ সহপাঠীদের একটি গ্ৰুপ ছবি সংযুক্ত ছিল। বই দুটি আমার সংগ্রহে ছিল। সুদর্শন দাশ পেশায় শিক্ষক ছিলেন। তাঁর অন্য দুইভাই দেবেন্দ্র দাশ ছিলেন সংগীতের শিক্ষক এবং দুর্যোধন দাশ দাশ ছিলেন চিত্রশিল্পী। দুর্যোধন দাশকে নবীগঞ্জে পেশাদার আর্টের পাইওনিয়ার ধরলে এ পেশায় সুভাষ তৃতীয় ব্যক্তি, দ্বিতীয় ছিলেন নহরপুরের আব্দুল মন্নান। সুভাষের হাত ধরে এই পেশায় আসে শিবপাশার বনমালী দাশ। তবে চিত্রকলায় সুভাষের পাশাপাশি আরেকজনের নাম উল্লেখ না করলেই নয় তিনি হলেন আমাদের সিনিয়র, মানবেন্দ্রদা, এডভোকেট মানবেন্দ্রকুমার দাশ, শিবপাশা, আইনজীবী, হবিগঞ্জ জজকোর্ট। ১৯৮০ সালে আমাদের প্রকাশিত লিমেরিক সংখ্যা ‘কলমতরাস’ এর আকর্ষণীয় প্রচ্ছদটি এঁকেছিলেন মানবেন্দ্রদা। বর্তমানের ডিজিটেল যুগে নবীগঞ্জে হয়তো অনেক আর্টের দোকান সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু এই লাইনের যাঁরা ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন তাঁদের সম্পর্কে তারা কতটুকু অবগত আমি জানিনা। না জানা থাকলে এই তথ্যগুলি তাদের কাজে আসবে।।এগুলিও নবীগঞ্জ শহরের ইতিহাসের অংশ।
সুভাষের চিত্রকর্ম নিয়ে এবার একটি মজার স্মৃতির কথা বলি। ১৯৯২ সালে আমার বিয়েতে উপহার দেবে বলে একটি পেইন্টিং এ হাত দেয় সুভাষ কিন্তু এর ফিনিশিং দিতে দিতে বৌভাত অনুষ্ঠানের সময় এসে যায়। তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ হলতো রং আর শুকাতে চায়না এদিকে অনুষ্টানের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। অবশেষে ক্যানভাসের কাঁচা রং আলতো করে ধরেই আমাদের বাড়ির দিকে রওয়ানা দেয় সে, ভরসা শিবপাশা থেকে গন্ধা আসতে আসতে বাতাসে রং শুকিয়ে যাবে। রং শুকাল সুভাষও আমাদের বাড়িতে পৌছল ঠিক কিন্তু ততক্ষণে পার্টি ওভার। আমি নববধুকে নিয়ে শশুরবাড়ির উদ্দেশে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছি তখনই দেখি শিল্পী হন্তদন্ত হয়ে তার শিল্পকর্ম বগলধাবা করে অনুষ্টানে যোগ দিতে আসছে। আমি সুভাষকে আমার বড়ভাইয়ের হাওলা করে শশুরবাড়ি রওনা দিলাম।
আমার বড়ভাই আলাউদ্দিন আহমেদ সংস্কৃতি আর বইপাগল মানুষ ছিলেন। তিনি শিল্পী হিসেবে সুভাষকে খুবই স্নেহের দৃষ্টিতে দেখতেন। তিনি তাকে সাদরে আপ্যায়ন করলেন। সকল উপহারের চেয়ে সুভাষের উপহারেই তিনি বেশি মুগ্ধ হয়েছিলেন। প্রায়শ আমার ঘরে ঢুকে দেয়ালে টানানো সুভাষের পেইন্টিং এর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতেন এবং তার শিল্প ভাবনায় ডুববার চেষ্টা করতেন।
সহপাঠী বন্ধুদের অনেকেই জীবনের ইনিংস শেষ করে প্যাভিলিয়নে ফিরে গেছে। নিজেও আছি মাহমুদুল্লাহর মত নড়বড়ে অবস্থায়। অবশ্য নিজের উইকেট নিয়ে ভাবি না কারণ নিশ্চিত ড্র ম্যাচের অপ্রয়োজনীয় টিকে থাকা না থাকার কোনো গুরুত্বই নেই কিন্তু সুভাষ তার ইনিংসটা আরও লম্বা করুক, অন্তত গণপাঠাগারের স্বার্থে, এই কামনা নিরন্তর।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
Leave a Reply