অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, নজরুলের সাংবাদিকতার সঙ্গে সাহিত্যকর্মের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। তাঁর সম্পাদিত সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় রচনাসমূহের সংকলন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- সমসাময়িক প্রসঙ্গ ধারণ করেও সে সব রচনা চিরকালীন আবেদনে ভাস্বর। নজরুল বহুলপঠিত হলেও তাঁর সাংবাদিক-সত্তা আমাদের সাহিত্য-পরিসরে তেমন একটা আলোচিত বিষয় নয়। বাংলা একাডেমির আজকের সেমিনার এ বিষয়ে আমাদের নতুন ধারণা দেবে বলে আশা করা যায়।
ড. ইসরাইল খান বলেন, সংবাদপত্রকে সাহিত্যিক ও শৈল্পিক করে জনগণের মনের গহীনে প্রবেশের কলাকৌশল বাংলার একজন অন্যতম প্রধান শিল্পী নজরুল খুব ভালো করেই জানতেন। তিনি জানতেন মানুষের হৃদয়তন্ত্রীতে স্থায়ী আসন গড়ে তোলার কৌশল। তাই তাঁর সাংবাদিকতার নমুনা এখনও গবেষণার আকর বিষয়রূপে সমাদৃত। তিনি বলেন, কবি নজরুলের সাংবাদিক-কর্মগুলোর শাশ্বতরূপ খোঁজার জন্য অনেক অনেক দীর্ঘ সময় নেয়া যায়। কিন্তু আজ আর তার খুব বেশি প্রয়োজন নেই। নজরুল ইসলাম নবযুগ, ধূমকেতু, গণবাণী প্রভৃতিতে যত কবিতা ও বিবিধ রচনা লিখেছিলেন তা তাঁর রচনাবলিতে স্থায়ী সাহিত্যমূল্য লাভ করেছে। কৌতূহলী কেউ যদি পত্র-পত্রিকায় সমকালীন পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে রচিত সাংবাদিক নজরুলের লেখাগুলোর স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য নিরুপণের প্রয়াস পান, তাহলে তিনি আরও আনন্দদায়ক তথ্য-উপকরণ আবিষ্কার করতে পারবেন।
আলোচকদ্বয় বলেন, নজরুল আমাদের সাংবাদিকতায় নবযুগ সঞ্চার করেছেন। পরাধীন ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক গোলামির বিরুদ্ধে তিনি যেমন তাঁর কবিতায় সোচ্চার ছিলেন তেমনি তাঁর সম্পাদিত পত্রপত্রিকায় তিনি সর্বাত্মক স্বাধীনতার দাবিকে সাকার করে তুলেছেন। নজরুলের ধূমকেতু, লাঙল, গণবাণী- এমন এক একটি সংবাদ-সাময়িকপত্র ছিল এক একটি মহাবিদ্রোহের নাম। তাঁরা বলেন, নজরুল তাঁর সংবাদপত্রে হিন্দু-মুসলমান মিলনের বার্তা যেমন দিয়েছেন তেমনি ঈদসংখ্যা, শারদীয় সংখ্যা, মহররম সংখ্যা প্রকাশের যুগান্তকারী পদক্ষেপও তিনি নিয়েছেন সেসব পত্রপত্রিকায়। বলা যায় নজরুলই আমাদের গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব।
অনুষ্ঠানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে গবেষণায় বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত ‘নজরুল পুরস্কার ২০২৬’-প্রাপ্ত গবেষক বিশিষ্ট অধ্যাপক রশিদুন্ নবী এবং নজরুলসংগীত-চর্চায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘নজরুল পুরস্কার ২০২৬’-প্রাপ্ত প্রখ্যাত নজরুলসংগীত শিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরা’র হাতে সম্মাননাপত্র, ক্রেস্ট এবং পুরস্কারের অর্থমূল্য (প্রতিটি) ১,০০,০০০/- (এক লক্ষ) টাকার চেক তুলে দেন বাংলা একাডেমির সভাপতি এবং মহাপরিচালক।
পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করে পুরস্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং ফাতেমা তুজ জোহরা বলেন, নজরুলের নামে নামাঙ্কিত পুরস্কার গ্রহণ এক অনন্য অনুভবের জন্ম দেয় হৃদয়ের গভীরে, কেননা নজরুল নিরন্তর আমাদের ব্যক্তিগত জাতীয় হৃদয়ের মণিকোঠায় অবস্থান করেন।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, নজরুলের সাংবাদিকতা আমাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, তিনিই সংবাদপত্রের মাধ্যমেই ভারতবর্ষের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার কথা বলেছেন। শুধু তাই নয়, তাঁর সম্পাদিত প্রতিটি পত্রিকার পাতায় পাতায় তিনি শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের মুক্তির কথা প্রচার করেছেন। সাংবাদিক নজরুল এবং সাহিত্যিক নজরুল- তাই নজরুলচর্চায় অবিচ্ছেদ্য আলোচ্য বিষয়।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নজরুলের কবিতা আবৃত্তি করেন বাচিকশিল্পী সীমা ইসলাম। নজরুল সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী সুজিত মুস্তাফা ও ইয়াসমিন মুশতারী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক সায়েরা হাবীব।
Leave a Reply